বিপিএলের ইতিহাস এবং কে কতবার জিতেছে শিরোপা!
ফুটবল বুটের ইতিহাস
ফুটবল বুট বা উত্তর আমেরিকায় যাকে ক্লিটস বা সকার বুট বলা হয়, ফুটবল খেলার সময় খেলোয়াড়দের এটি একটি অপরিহার্য সরঞ্জাম যা ফিফা কর্তৃক স্বীকৃত। নগ্ন পা থেকে শুরু করে, ফুটবল বুট বহু বছর ধরে গবেষণা, উন্নয়ন, স্পন্সরশিপ এবং বিপণনের মাধ্যমে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছে এবং এখন একটি বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বর্তমানে।
এই নিবন্ধে আমরা ফুটবল বুটের ইতিহাস অন্বেষণ করব, কিভাবে এটি বছরের পর বছর ধরে বিকশিত হয়ে আজকের বিশেষায়িত জুতা হয়ে উঠেছে তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করব। আসুন শুরু করা যাক।
১৮০০ শতক : প্রারম্ভিক সময়
১৯ শতকে ফুটবল গ্রেট ব্রিটেনে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে খেলোয়াড়রা তাদের ভারী এবং শক্ত কাজের জন্য ব্যবহার করা বুট পরে খেলত। এই বুটগুলো ছিল প্রথম বুট যার সামনে স্টিলের টো ক্যাপ, লম্বা লেস এবং উঁচু টপ ছিল। আঁকড়া ধরে রাখার জন্য বুটের নীচে ধাতুর স্টাড বা ট্যাক যোগ করা হয়েছিল। ১৯ শতকের পরের দিকে প্রথম ফুটবল-নির্দিষ্ট বুট ডিজাইন করা হয়েছিল, যা ঘন এবং ভারী চামড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এবং বেশি সুরক্ষার জন্য গোড়ালি পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। প্রথম বুটের ওজন ছিল ৫০০ গ্রাম এবং ভিজলে এটি দ্বিগুণ হয়ে যেত।
১৯০০ -১৯৪০ : মৌলিক জিনিস নিয়ে পথচলা
এই সময়কালে ফুটবল বুটের স্টাইল খুবই সাধারণ ছিল। গোলা, হামেল এবং ভ্যালস্পোর্টের মতো অনেক বিখ্যাত ফুটবল বুট প্রস্ততকারক যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে আরও বেশি জনপ্রিয় হলেও, ফুটবল বুটের ডিজাইন খুবই সহজ ছিল।ফুটবল বুটের ডিজাইন শুরুর দিকের মতোই ছিল।
১৯৪০ – ১৯৬০ : নাটকীয় পরিবর্তন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফুটবল বুটের ডিজাইনে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। দক্ষিণ আমেরিকার খেলোয়াড়রা প্রথম হালকা ও নমনীয় বুট পরতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই ডিজাইনের মূল ফোকাস ছিল বেশি সুরক্ষার পরিবর্তে ভালো নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তিশালী শুট করার ক্ষমতা বাড়ানো। ১৯৫৪ সালে আদি দাসলার স্ক্রু-ইন স্টাড চালু করেন, যা সেই বছর বৃষ্টি ভেজা বিশ্বকাপে জার্মান দলকে স্পষ্ট সুবিধা দেয়। তবে তার বড় ভাই, পুমার প্রতিষ্ঠাতা রুডল্ফ দাসলার দাবি করেন যে স্ক্রু-ইন স্টাড তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন।
১৯৬০-এর দশকে অনেকগুলো ফুটবল বুটের ডিজাইন কমসংখ্যক কাটা দিয়ে করা হয় ফলে ফুটবল বুট হালকা ও নমনীয় হতে শুরু করে। সেসময় এগুলো ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়দের ব্যবহার করতে দেখা যায়। ফলে এইসব বুট মাঠে তাদের দ্রুত চলাচল এবং দিক পরিবর্তন করতে সাহায্য করে। মিত্রে, জোমা এবং অ্যাসিক্স এইসব নামীদামী ব্র্যান্ডগুলো এই প্রতিযোগিতায় যোগ দেয় । সবচেয়ে অবাক করা তথ্য, ১৯৬৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ৭৫% খেলোয়াড় অ্যাডিডাস পরে, যার ফলে এই দশকে অ্যাডিডাস শীর্ষ প্রস্তুতকারক হয়ে ওঠে।
১৯৭০ – ১৯৯০ : অগ্রগতি এবং পরিবর্তন
১৯৭০-এর দশকে ফুটবল বুটের ডিজাইনে অনেক অগ্রগতি এবং পরিবর্তন ঘটে। এর মধ্যে হালকা বুট এবং বিভিন্ন রঙ এর বুট অন্তর্ভুক্ত ছিল। বুট স্পন্সরশিপও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। অ্যাডিডাস এই সময়কালে বুটের মার্কেটে শীর্ষ অবস্থানে ছিল, এইসময় পায়ের পাতার সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নতুন প্রযুক্তি যেমন প্যাডিং প্রকাশ করে। এই দশকের শেষে ১৯৭৯ সালে, সর্বকালের সেরা বিক্রিত বুট, কোপা মুন্ডিয়াল প্রকাশ করে তার অবস্থানকে সুদৃঢ় করে। এই সময়কালে ক্যাঙ্গারু চামড়া, বাছুরের চামড়া এবং পূর্ণ-শস্য/গরুর চামড়া সহ কিছু সর্বাধিক সাধারণ ধরণের প্রাকৃতিক চামড়া উৎপাদনে আসে। ডায়ডোরা ব্র্যান্ড এই দশকে বাজারে প্রবেশ করে।
১৯৮০-এর দশকে ফুটবল বুটের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ১৯৭০-এর দশকের চেয়ে আরও অগ্রগতি হয়েছিল। উম্ব্রো (UMBRO), লটো (LOTTO) এবং কেলমে (KELME) এই দশকে বাজারে যোগ দেয় এবং ফুটবল বুট তৈরিতে সিনথেটিক উপকরণ ব্যবহারের একটি নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করে।
১৯৯০ – ২০০০ : ফুটবল বুটে প্রযুক্তির ব্যবহার
১৯৯০-এর দশকে খেলোয়াড়ের ভারসাম্য বাড়ানোর জন্য ফুটবল বুটে নতুন ধরনের সোল চালু করা হয়েছিল এবং অস্ট্রেলিয়ান ক্রেগ জনস্টনের দ্বারা ডিজাইন করা অ্যাডিডাস প্রিডেটর ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল এবং তাৎক্ষণিক সাফল্য অর্জন করেছিল। মিজুনো (MIZUNO), রিবক (REEBOK), উহলস্পোর্ট (UHLSPORT) এবং নাইকি (NIKE) এই দশকে ফুটবল বুট তৈরি শুরু করে। নাইকির প্রথম বুট, নাইকি মার্কুরিয়াল ভেপর, ১৯৯৮ সালে প্রকাশের পরপরই মার্কেটে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল এবং রোনাল্ডো নাজ্জারিও ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপে এটি পরার পর তা দ্রুতই ফ্যানদের প্রিয় হয়ে ওঠে।
২০০০-এর দশক: একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে লেজার প্রযুক্তি চালু হয়েছিল, ফলে ২০০৬ সালে প্রথম সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড ফুটবল বুট তৈরি হয়েছিল । প্রথম লেসহীন বুট, লটো জেরো গ্র্যাভিটিও ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০০-এর দশকের শেষের দিকে লেসহীন বুট খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
২০১০ পরবর্তী : প্রযুক্তি এবং কাস্টমাইজেশনের সূচনা
খেলার আধুনিক যুগে খেলোয়াড়দের গতি বৃদ্ধি এবং খেলোয়াড়দের কৌশলগত দিক বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রস্তুতকারকরা নতুন প্রযুক্তি চালু করেছে, যার মধ্যে বিকল্প উপকরণ দিয়ে তৈরি হালকা জুতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানের সাথে বুট কাস্টমাইজেশনও আরও প্রভাবশালী হয়ে ঊঠেছিল।
২০১০ সালে লেসহীন বুট জনপ্রিয় হতে থাকে, ২০১৬ সালে অ্যাডিডাস এইস পিউরকন্ট্রোল (ACE PURE CONTROL) প্রকাশ করে। এই বুটে কোনো লেস ছিল না এবং এটি সর্বোচ্চ আরাম ও পারফরম্যান্স দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল।
২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে "ব্লেড" নামে পরিচিত একটি নতুন ধরনের সোল চালু করা হয়েছিল। এই সোলগুলিতে বিশেষভাবে ডিজাইন করা বুট থাকে যার মুখ বহুদিকে থাকে, তাত্ত্বিকভাবে আঁকড়া বাড়ানো এবং গোড়ালির আঘাত কমাতে এই ডিজাইন করা হয়েছিল । তবে, "ব্লেডযুক্ত" ফুটবল বুটগুলি ইউকে-র কিছু ক্রীড়া সংস্থার সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে কারণ এগুলি খেলোয়াড়দের জন্য সম্ভাব্য গুরুতর আঘাতের কারণ হতে পারে মনে করা হয়েছিল।
সিন্থেথিকের উত্থান :
কাস্টমাইজেশনের পাশাপাশি নতুন নতুন উপকরণের ব্যবহারও ফুটবল বুটের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যদিও চামড়া দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল বুটের জন্য প্রাথমিক উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে,তবে ১৯৯০ এবং ২০০০-এর দশকে সিন্থেথিক উপকরণ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে। এই উপকরণগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে বুটের স্থায়িত্ব এবং কম ওজন সহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে থাকার কারণে।
ফুটবল বুটে ব্যবহৃত সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনথেটিক উপকরণ হল পলিইউরেথেন (PU)। PU হল একটি হালকা, নমনীয় উপাদান যা অনেক আধুনিক ফুটবল বুটের উপরের অংশ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। ফুটবল বুটে ব্যবহৃত অন্যান্য সিন্থেথিক উপকরণের মধ্যে নাইলন, জাল এবং বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত।
সম্প্রতি কয়েক বছরে সিনথেটিক উপকরণ বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও, কিছু খেলোয়াড় এখনও চামড়ার বুট পছন্দ করে। বিশেষ করে ক্যাঙ্গারু চামড়া অনেক পেশাদার খেলোয়াড়দের পছন্দ, এর নরমতা, স্থায়িত্ব এবং সময়ের সাথে পায়ের সাথে খাপ খাওয়ানোর কারণে।
বাংলা
English
