বডিলাইন পদ্ধতি কী? জানুন লেগবাই এর ইতিহাস!
বডিলাইন পদ্ধতি কী? জানুন লেগবাই এর ইতিহাস!

ক্রিকেটের এক কিংবদন্তীর নাম স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। ক্রিকেটের অনেক গল্পই লেখা হয়েছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এ ব্যাটসম্যানকে কেন্দ্র করে। ঠিক তেমনি, তাকে ঘিরেই জন্ম নেয় ‘বডিলাইন’ পদ্ধতি। ডন ব্র্যাডম্যানকে আটকাতে গিয়েই এ পদ্ধতি আবিষ্কার ও প্রয়োগ করেন ইংরেজরা। চলুন জেনে নেওয়া যাক বডিলাইন টেস্টের সে বিতর্কিত ইতিহাস।

সালটা ১৯৩০। ইংল্যান্ডে চলছে অ্যাশেজ সিরিজ। সিরিজ শেষে দেখা গেলো স্যার ডন ব্র্যাডম্যান একাই ১৩৯.১৪ গড়ে করেছেন ৯৭৪ রান, যা এখনো রেকর্ড! সেই সিরিজে তিনি একাই ইংরেজদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে জেতান ২-১ ব্যবধানে। ১৯৩২-১৯৩৩ সালের অ্যাশেজ সিরিজের আগে তারা খুব ভাল ভাবেই বুঝতে পারে ব্র্যাডম্যানকে আটকানো ছাড়া সিরিজ যেতা সম্ভব না। তৎকালীন ইংল্যান্ড দলনেতা ডগলাস জার্ডিন ডন ব্র্যাডম্যানের একটি দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছিলেন। আগের সিরিজেই লেগ স্ট্যাম্পে লাফিয়ে ওঠা বল খেলতে ব্র্যাডম্যানের অসুবিধা হচ্ছিল। ঠিন সেখান থেকেই তার মাথায় আসে 'ফাস্ট লেগ থিওরি' বা 'বডিলাইন' পদ্ধতি। এটি জটিল কোন বিষয় নয়। এর মূল বেপার হলো, লেগ স্ট্যাম্প এর লাইনে, ব্যাটসম্যান এর শরীর লক্ষ্য করে একের পর এক দ্রুত গতির বল করা। যাতে বল ব্যাটসম্যান এর মাথার কাছাকাছি উচ্চতায় চলে যায়। খুব সহজ ভাষায় এখন আমরা যাকে ‘বাউন্স’ বল হিসেবে চিনি।

এ বোলিং পদ্ধতি ব্যবহারের ঝুঁকি ছিল প্রচুর, এটি ছিল বিতর্কিতও। তখনকার সময় শরীরের উপরিভাগে চেস্ট গার্ড পড়ার রীতি ছিল না। অতি প্রয়োজনীয় হেলমেটই চালু হয়েছে ৭০ এর দশকে। ফলে ওই সময় এ পদ্ধতি একজন ব্যাটসম্যানকে মারাত্মকভাবে জখম পর্যন্ত করতে পারতো। তার ওপর সেসময় লেগ সাইডে ফিল্ডার নিয়ে ছিল না কোন বিধিনিষেধ। এই বডিলাইন প্রথাতে জার্ডিনের মূল হাতিয়ার ছিলেন ইংল্যান্ড পেসার হ্যারোল্ড লারউড এবং বিল ভোস। তাদের দুজনেরই দ্রুত গতির আগ্রাসী বোলিং করার  নিখুঁত লাইন লেন্থ ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল। জার্ডিন তার এই পরিকল্পনায় সফল ছিলেন। তাদের দ্রুতগতির বোলিং কাজে লেগেছিল জাদুর মত। বডিলাইন পদ্ধতি আগে থেকে প্রচলিত থাকলেও ৯২-৯৩ অ্যাশেজ সিরিজের মাধ্যমেই মূলত এটি সাফল্য ও কুখ্যাতি দুটোই লাভ করে। গোটা সিরিজে লারউড-ভোসদের লেগ স্ট্যাম্পে দ্রুত গতির বলে কখনোই স্বস্তি পাননি অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা। পাশাপাশি লেগ সাইড ঘিরে থাকা পাঁচজন ফিল্ডার তো ছিলই। শরীরের দিকে ধেয়ে আসা একেকটি গোলার মত বল খেলতে না পেরে, নিজেকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে লেগ সাইডে ওত পেতে থাকা ফিল্ডার এর হাতে ক্যাচ দিয়ে একে একে ফিরে আসছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানরা। এর আসল প্রভাব পড়ে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে, যেটি বডিলাইন এর জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত।

এই ম্যাচেই লারউড এর বলে আহত হয়ে মাঠ ছাড়েন অস্ট্রেলিয়ান দুই ব্যাটসম্যান, উডফুল ও বার্ট- ওল্ডফিল্ড। লারউড এ ম্যাচে একাই নেন ৭টি উইকেট। ম্যাচে ৩৩৮ রানের বিশাল জয় পায় ইংল্যান্ড। সিরিজের বাকি দুটি ম্যাচ খুব সহজেই জিতে নেয় ইংল্যান্ড। এ সিরিজেও দুই দল মিলিয়ে সর্বোচ্চ, ৩৯৬ রান করেন ডন ব্র্যাডম্যান। এটি ছিল আগের সিরিজে তার নিজের রানের অর্ধেকেরও কম। এ সিরিজের পর বিতর্ক এতটাই তীব্র ও তিক্ত হয় যে অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডের সঙ্গে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন করার কথা ভেবেছিল। তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ শেষে অখেলোয়াড় সুলভ মানসিকতার অভিযোগ করলেও পরে প্রত্যাহার করে নেয় অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু বডিলাইন বিতর্ক থিতলো না – এ ধরনের বিপজ্জনক বোলিং বন্ধ করতে এমসিসি আইন পাল্টাতে বাধ্য হল। আর ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড অস্বস্তি ঢাকতে দোষ চাপালো লারউড এর ঘাড়ে, যদিও তিনি শুধু অধিনায়ক এর আদেশ পালন করেছিলেন। তাকে বলা হয় খেলা চালিয়ে যেতে হলে তাকে দুই দেশের বোর্ডের কাছেই ক্ষমা চাইতে হবে, কিন্তু তিনি তা করেননি। পরবর্তীতে আর কোনদিন ন্যাশনাল লেভেলের ক্রিকেটও খেলেননি। বিল ভোসও নিজের কাজের জন্য অনুশোচনা করেননি। কারণ তখন এর বিরুদ্ধে কোন আইন ছিল না, আর এটি নিষিদ্ধও ছিল না।

ইংলিশ মিডিয়া এ পদ্ধতিকে ফাস্ট লেগ থিওরি নাম দিলেও, সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক হাগ বাগ থম ‘বডিলাইন’ কথাটি ব্যবহার করেন। ফ্যাক্সের অর্থ বাঁচানোর জন্য তিনি ‘ইন দ্য লাইন অফ বডি’ না লিখে কেবল ‘বডিলাইন’ ব্যবহার করেন আর সেটিই অমরত্ব লাভ করে! ২০০৪ সালে ক্রিকেটের সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার ও খেলোয়াড়দের নিয়ে হওয়া এক পোলে এ বডিলাইন টেস্টকে ক্রিকেটের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

This platform is proudly developed and supported by Trenza Softwares